হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনছে?

তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাবে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট (মজলিস)।

তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাবে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট (মজলিস)। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্য রুট বন্ধের হুমকি বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। যেকোনো মুহূর্তে এ পথ দিয়ে জ্বালানিসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহন বন্ধের ঘোষণা দিতে পারে ইরান। তবে এরই মধ্যে ক্ষতির আশঙ্কায় এ পথ এড়িয়ে চলা শুরু করেছে জাহাজ ও জ্বালানিবাহী ট্যাংকার। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করা দেশগুলোয় জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

কয়েক দিন আগে দুই খালি সুপারট্যাংকার কসউইজডম লেক ও সাউথ রয়্যালিটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের পর হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে। এরপর পারস্য উপসাগরের মুখ থেকে আরো দক্ষিণে চলে যায়। কারণ তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। শুধু কসউইজডম লেক বা সাউথ রয়্যালিটিই নয়, অনেক জাহাজ কোম্পানিই গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ নিয়ে এমন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ইরানে ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই আলোচনায় রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পাল্টাপাল্টি জবাবের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন আকাশ হামলায় উত্তেজনা নতুন মোড় নিয়েছে। যদিও এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এতে জ্বালানি তেলের ফিউচার মূল্য প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দামে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনের অনিশ্চয়তার ছাপ পড়তে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান টরটয়েজ ক্যাপিটালের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার রব থামেল বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। ইরান এখানে ব্যাঘাত ঘটালে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।’

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী জলপথটির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত। তবে জ্বালানি তেল পরিবহনের পথ অনেক সংকীর্ণ। বিশাল সুপারট্যাংকার চলাচলের রুটটি মাত্র দুই মাইল প্রশস্ত। ফলে জাহাজকে ইরান ও ওমান উভয় অঞ্চলের জলসীমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সিএনএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পৃথিবীতে খুব কম জায়গা আছে যেগুলো এতটা কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল বা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

প্রণালি বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে চীন ও অন্য এশীয় দেশগুলো। কারণ এ পথ দিয়েই তারা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এলএনজির বড় অংশ আমদানি করে। ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়েছে, তার যথাক্রমে ৮৪ ও ৮৩ শতাংশ গেছে এশিয়ার বাজারে।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান থেকে ৫৪ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানি করেছে চীন। এরপর ভারত ২১ লাখ ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল ১৭ লাখ ব্যারেলের গন্তব্য। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আমদানি ছিল কম, মাত্র চার ও পাঁচ লাখ ব্যারেল।

ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানির মতে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ভূরাজনৈতিক সুবিধা থাকায় ইরান জ্বালানি তেলের বাজারে ধাক্কা, মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ধসিয়ে দিতে সক্ষম।

তবে সম্প্রতি ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ভান্দনা হরির পূর্বাভাস ছিল, ইরান জলপথটি বন্ধ করবে এমন আশঙ্কা খুবই সীমিত। মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এটি প্রতিরোধ করতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘ইরান যদি প্রণালি বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের অনেক ক্ষতি হবে এবং খুব কমই লাভ হবে। জ্বালানি তেল উত্তোলক প্রতিবেশীদের শত্রুতে পরিণত করতে চায় না চীন, মূল ক্রেতা চীনকেও রাগাতে চায় না।’

জ্বালানি তেল পরিবহনকারী ট্যাংকার মালিক ও ব্যবসায়ীরা এখন নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এরই মধ্যে জাহাজ চলাচলের সতর্কতা ও ভাড়া বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। জাপানের দুটি বৃহৎ শিপিং কোম্পানি নিপ্পন ইউসেন ও মিৎসুই ওএসকে লাইনস নিজেদের জাহাজকে গতকাল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় কমিয়ে আনতে নির্দেশ দিয়েছে। গ্রিসের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশনা জারি করেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের আগে পরিস্থিতি ভালো করে বিশ্লেষণ ও সম্ভব হলে নিরাপদ বন্দরে অবস্থান করতে হবে।

অনেক মালিক ও পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ভাড়া দেয়া স্থগিত রাখায় এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি হয়ে জাহাজ চলাচলে ভাড়া বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়াগামী সুপারট্যাংকারের ভাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ১৭ জুন মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে ২০ লাখ ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকারের জন্য ভাড়া বেড়ে ৭০-৭১ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্টসে পৌঁছে, যেখানে ১২ জুন তা ছিল মাত্র ৪৪। ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্ট হলো একটি রুটভিত্তিক নির্ধারিত বেস রেটের শতকরা হার। দৈনিক হিসেবে ১৭ জুন ট্যাংকার ভাড়া ছিল প্রায় ৪৬ হাজার ডলার, যা আগের দিনের তুলনায় ১২ হাজার ডলার বেশি—গত বছরের ফেব্রুয়ারির পর থেকে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।

আরও